পুলিশ পাহারায় তানভিরের আজ জন্মদিন

Posted: অগাষ্ট 22, 2010 in Uncategorized

মাকে ছাড়া তানভিরের এবার নবম জন্মদিন পালন হচ্ছে। জন্মদিনে কেক কাটা হবে। মামা নিজ হাতে বিরিয়ানি রান্না করবেন। রমজান মাসের কারণে থাকছে হালিম, ছোলামুড়ি, পেঁয়াজু, বেগুনি। কিন্তু থাকছে না মা। কোনোদিন থাকবেনও না। ২০০৩ সালে যখন দুই বছর তিন মাস বয়স, তখন তার সামনেই প্রিয় মাকে গলাটিপে হত্যা করে বাবা। সেই থেকে নানা-নানি-মামার কাছে বড় হয়ে উঠছে তানভির। তানভিরের এ বড় হয়ে ওঠাআর দশটি সাধারণ ছেলের মতো নিশ্চিন্তে নয়। প্রতিমুহূর্ত মৃত্যুভয় তাকে তাড়া করে ফিরছে। গত ছয়টি বছর তার কেটেছে পুলিশ আর নানা, নানি ও মামার সতর্ক পাহারায়। নানির সঙ্গে এক রিকশায় সকালে স্কুলে যাওয়া, স্কুল ছুটির পর ফিরে আসা, সারাদুপুর ঘরের মধ্যে ছোটাছুটি। তারপর বিকেলে যখন বাইরে গলির রাস্তায় যাওয়ার জন্য আকুল হয়ে ওঠে মন তখন অপেক্ষায় থাকতে হয় কখন থানা থেকে পুলিশ মামারা আসবেন। তারা এসে বাইরে পাহারা দিলে তবেই সে খেলতে পারবে। গত ছয়টি বছর এ নিয়মের ব্যতিক্রম নেই।

সবার চোখে চোখে থেকে হাঁপিয়ে উঠেছে তানভির। সারাদিন প্রায় অন্ধকার ঘরে থাকতে থাকতে চোখে মাইনাস পাওয়ারের চশমা উঠেছে। তানভির এখন একাকী থাকতেই বেশি পছন্দ করে। নিরাপত্তার কারণে লোহার গ্রিলের দরজা, বারান্দায় দরজা, তারপর কক্ষের দরজা পেরিয়ে তানভিরদের ড্রইং রুমে যেতে হয়। দেয়ালের একপাশে যত্ন করে টাঙিয়ে রাখা হয়েছে কয়েকটি ছবির ফ্রেম। সব ছবিতেই শান্তর ছবি। ছবি দেখেই ভুলে যাওয়া মাকে মনে করে নেয় তানভির। ঘরের মধ্যে যাবতীয় খেলনা কিনে দেওয়া হয়েছে। তাই নিয়ে সারাদিন মেতে থাকে। পরিবারের সবার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দিন দিন অসহিষ্ণু হয়ে উঠছে তানভির। স্কুলের সামনে গেলেই তানভির অস্থির হয়ে ওঠে। নানিকে বারবার প্রশ্ন করে সবার মা স্কুলে আসে। কিন্তু তার মা কেন আসে না। বাবার কথা ভুলেও জিজ্ঞাসা করে না। বাবাকে সে নাম ধরেই ডাকে।
তানভিরের কথা বলতে গিয়ে স্মৃতিকাতর হয়ে ওঠেন নানি গুলশান আরা রোজি। নিজের সন্তান হারানোর বেদনায় দুচোখ বেয়ে পানি নেমে আসে। তিনি সমকালকে বলেন, ‘ওর (তানভির) মা নুসরাত হক শান্তু খুব ‘শান্ত’ ছিল। পড়ালেখায়ও ভালো ছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবিএ পড়ত। পড়ালেখা চলা অবস্থাতেই স্থানীয় যুবক সবুজের সঙ্গে বিয়ে হয়। বিয়ের পর তানভিরের জন্ম। কিন্তু তারপরই সবুজের চেহারা পাল্টে যায়। নানা কারণে অত্যাচার চালাতে থাকে। ওরা চাঁদপুরে বাসা নিয়েছিল। একদিন চট্টগ্রাম থেকে অচেনা কণ্ঠে টেলিফোন করে জানায়, ‘শান্তুকে মেরে ফেলা হয়েছে। তখনই আমরা ছুটে যাই।’ এটুকু বলতে বলতে বাষ্পরুদ্ধ হয়ে ওঠে তার কণ্ঠ। কিছুক্ষণ চুপ থাকেন। তারপর আবার বলেন, তানভিরের সামনেই তার মাকে মেরে ফেলা হয়। ওই একমাত্র সাক্ষী। ওর সাক্ষ্যেই নিম্ন আদালত ২০০৭ সালের ২০ জুন সবুজের ফাঁসি এবং সবুজের বাবা-মাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়। আদালত থেকে জামিন নিয়ে দাদা-দাদি বেরিয়ে এসেছে। তারপর থেকেই ওরা চাচ্ছে তানভিরকে মেরে ফেলতে। উচ্চ আদালতে তানভিরকে আবারও সাক্ষ্য দিতে হবে। তখন তানভির বেঁচে না থাকলে সবুজ ছাড়া পেয়ে যাবে। কয়েকবার সবুজের ভাইয়েরা তানভিরকে অপহরণের চেষ্টাও করেছে। কিন্তু পারেনি। তারপর থেকেই স্থানীয় থানা থেকে টহল পুলিশ পাঠিয়ে ওকে পাহারা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়।

সংগ্রহ-দৈনিক সমকাল ২২.০৮.১০

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s