প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটনের সময় এসেছে

Posted: অগাষ্ট 23, 2010 in Uncategorized

অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন
সংবিধানের ৫ম সংশোধনীর মাধ্যমে কর্নেল তাহেরের প্রহসনের বিচারের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার সুযোগ বন্ধ হয়েছিল। ৩৪ বছর পর আদালত ৫ম সংশোধনী বাতিল করে দেওয়ায় সে বিচার যে প্রহসন ছিল, তা প্রমাণ করার সুযোগ এসেছে। সময় এসেছে প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন করার। অনেক আশা নিয়ে আদালতের দোরে হাজির হয়েছি। আশা করছি, যে মিথ্যা অপবাদ দিয়ে কর্নেল তাহেরকে ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল, সে অপবাদ দূর হবে। সরকার এ বিচার কাজে সহযোগিতা করবে। স্বচ্ছতার ভিত্তিতে প্রকৃত সত্য উন্মোচিত হবে। কর্নেল তাহেরকে বিচারের নামে সম্পূর্ণ প্রহসন করে ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল। আমরা ৩৪ বছর পর আপিল করেছি। আশা করছি সরকার এর বিরুদ্ধে দাঁড়াবে না, প্রতিপক্ষ হয়ে বিচার কাজকে বাধাগ্রস্ত করবে না।১৯৭৬ সালে বৈধ সরকারকে উৎখাত করার ষড়যন্ত্রের অভিযোগে আমরা চার ভাই কর্নেল তাহের বীরউত্তম, আবু ইউসুফ বীরবিক্রম, ওয়ারেসাত হোসেন বেলাল বীরপ্রতীক এবং আমিসহ ৩৩ জনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা করে তৎকালীন সরকার। যে অভিযোগে  কর্নেল তাহেরকে ফাঁসি দেওয়া হয়েছে সেই ১২১(ক) ধারায় সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। কিন্তু তাকে ফাঁসি দেওয়া হয়েছে। ট্রাইব্যুনালের এ রায়ে তৎকালীন সরকারের

প্রধান কেঁৗসুলি এটিএম আফজাল হোসেনও অবাক হয়েছিলেন। বলেছিলেন, ‘এটা তো কোনোদিন হতে পারে না।’ রায় ঘোষণা হয়েছিল ১৯৭৬ সালের ১৭ জুলাই। তৎকালীন আইন সচিব রায়ের ফাইলসহ জিয়াউর রহমানের সঙ্গে দেখা করে জানিয়েছিলেন, যে অভিযোগের ভিত্তিতে কর্নেল তাহেরকে ফাঁসি দেওয়া হয়েছে, সে অভিযোগে কাউকে ফাঁসি দেওয়া যায় না। কিন্তু জিয়াউর রহমান সে ফাইল ছুড়ে ফেলে নির্দেশ দিয়েছিলেন, ‘ফাঁসি কার্যকর করার ব্যবস্থা করেন, আর আইন তৈরি করেন।’ সে আইনও তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সে আইন হয়েছিল ২১ জুলাই ভোর রাত ৪টায় কর্নেল তাহেরকে ফাঁসি দেবার দশদিন পর ৩১ জুলাই।
৭ নভেম্বর নেতৃত্ব দিয়ে সিপাহী বিপ্লবের মাধ্যমে জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করেন কর্নেল তাহের। কিন্তু মুক্ত হয়েই তিনি সবাইকে গ্রেফতার করেন। ৩৩ জনের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে বৈধ সরকারকে উৎখাতের মামলা করেন। ১৯৭৬ সালে সামরিক অধ্যাদেশ ১৬ জারি করে ‘এক নম্বর বিশেষ সামরিক ট্রাইব্যুনাল’ গঠন করা হয়। ট্রাইব্যুনালে ৫ জন বিচারক ছিলেন। চেয়ারম্যান ব্রিগেডিয়ার ইউসুফ হায়দার মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাস ঢাকায় বসে পাকিস্তানিদের পক্ষ নিয়ে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন। জিয়াউর রহমান তাকেই ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান নিয়োগ করেন। এছাড়া বিমান বাহিনীর উইং কমান্ডার মোহাম্মাদ আবদুর রশীদ ও নৌবাহিনীর অস্থায়ী কমান্ডার সিদ্দিক আহমদ এবং নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মাদ আবদুল আলী ও হাসান মোর্শেদকে ট্রাইব্যুনালে সদস্য হিসেবে নিয়োগ করা হয়।
ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে কঠোর গোপনীয়তায় বিচার কার্যক্রম চলেছে। অধ্যাদেশের কারণে রায়ের বিরুদ্ধে আমরা আপিল করতে পারিনি। আমাদের কেঁৗসুলিদেরও শপথ নিয়ে শুনানিতে অংশ নিতে হয়েছে। আতাউর রহমান খান, অ্যাডভোকেট আমিনুল হক, অ্যাডভোকেট গাজীউল হক, অ্যাডভোকেট আবদুর রউফ (পরবর্তীকালে বিচারপতি), অ্যাডভোকেট শরিফউদ্দিন চাকলাদার (বর্তমান বিচারপতি), জুলমত আলী খান (মরহুম) আমাদের পক্ষে কেঁৗসুলি হিসেবে কাজ করেছেন। কিন্তু তাদেরও গোপনীয়তার শপথ পাঠ করতে হয়েছে। বিচার কাজের কোনো তথ্য বাইরে প্রকাশ করলে তাদের সর্বোচ্চ ৭ বছর সশ্রম কারাদণ্ডের বিধান ছিল। তাই বাইরের কেউ কিছু জানতে পারেনি। শুধু ১৭ জুলাই যে রায় ঘোষিত হয়েছিল, তা পরের দিন বাংলাদেশ অবজারভার পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।
বিচার কাজ শুরুর আগে আইনজীবীদের সঙ্গে যোগাযোগ করার সুযোগ দেওয়া হয়নি। ১৯৭৬ সালের ২১ জুন বিচার কার্যক্রম শুরু হয়। ওইদিনই তা ২৭ জুন পর্যন্ত মুলতবি করা হয়। ২৮ জুলাই পর্যন্ত সরকার পক্ষের সাক্ষী, আইনজীবীরা বক্তব্য রাখেন এবং অন্যান্য কার্যক্রম চলে। ১০ জুলাই থেকে ১৪ জুলাই পর্যন্ত আসামিপক্ষ বক্তব্য রাখার সুযোগ পায়। প্রথমদিকে আমরা বক্তব্য রাখি। ১৩ এবং ১৪ জুলাই, দু’দিন মিলিয়ে কর্নেল তাহের ৬ ঘণ্টা বক্তব্য রাখেন। ১৭ জুলাই বিকেলে রায় ঘোষণা হয়। অবশ্য এ রায় আগেই আর্মি হেডকোয়ার্টারে নির্ধারিত হয়েছিল। বিচারক শুধু তা পাঠ করেছিলেন। কর্নেল তাহেরকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। ১৭ জনের সাজা হয়েছিল। বাকি ১৬ জনের মুক্তি।
আমরা দেখেছি বঙ্গবন্ধু খুনিদের ফাঁসির রায় কার্যকর করতে কত প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। কত সময় লেগেছে। কিন্তু কর্নেল তাহেরকে দণ্ডাদেশের রায় ঘোষণার মাত্র ৭২ ঘণ্টার মধ্যে ফাঁসি দেওয়া হয়েছে। ১৭ জুলাইর বিকেলে রায় ঘোষণা এবং ২১ জুলাই ভোর রাতে ফাঁসি কার্যকর হয়েছে। রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করারই সুযোগ দেওয়া হয়নি। এমনকি যে রায় ঘোষণা হয়েছে, সে রায়ের কপিও আজ পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। এ অনিয়মের বিরুদ্ধে গত ৩৪ বছর লড়াই করেছি। ১৯৭৬ সালে বাংলাদেশ অবজারভার পত্রিকার একটি সংবাদকে ভিত্তি করে পুরো প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

সংগ্রহ- দৈনিক সমকাল

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s