একটি ভাগ্যবান প্রকল্প

Posted: অগাষ্ট 25, 2010 in Uncategorized

এটি একটি ভাগ্যবান প্রকল্পের কাহিনি। ১৮ বছরে এই প্রকল্পটি বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) বারবার বাদ পড়েছে, আবার ফিরে এসেছে। সরকার বদল হয়েছে, অর্থমন্ত্রীর পরিবর্তন হয়েছে। কিন্তু প্রকল্পটির প্রতি আগ্রহ কমেনি কখনোই। এটি সার কারখানা তৈরির একটি প্রকল্প। নিজের এলাকা সিলেটে সার কারখানা তৈরির প্রথম আগ্রহ দেখিয়েছিলেন সাবেক অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমান। শাহজালাল ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড নামের এই কারখানার প্রকল্প এডিপিতে অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন ১৯৯২-৯৩ অর্থবছরে। সংশোধিত এডিপিতে নতুন প্রকল্প হিসেবে অনুমোদন ছাড়াই এটি ঢুকে পড়েছিল। দীর্ঘ ১১ বছর এই প্রকল্প এডিপিতে অনুমোদনহীন ও বাস্তবায়নহীন অবস্থায় পড়ে ছিল। দাতাদের পক্ষ থেকে সাড়া না পাওয়াই এর কারণ। এর মধ্যে সরকার বদল হয়। পরবর্তী

আওয়ামী লীগ সরকারের অর্থমন্ত্রী সিলেটের শাহ এ এম এস কিবরিয়াও দাতাদের রাজি করাতে পারেননি। তবু প্রকল্পটি থেকেই যায়। বাস্তবায়িত না হলেও প্রকল্পের জন্য জনবল নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। এর ফলে একটি ইট না বসলেও প্রকল্পে নিয়োজিত জনবলের বেতন ভাতা ও আনুষঙ্গিক খাতে ১১ বছরে ব্যয় হয় দুই কোটি ৭৬ লাখ টাকা। এর পর আবার সরকার বদল হয়। আবার অর্থমন্ত্রী হন এম সাইফুর রহমান। তিনিও এভাবে রেখে দেন প্রকল্পটি। ২০০১ সালে সরকারের ব্যয় পর্যালোচনা করার জন্য এম হাফিজউদ্দিন খানকে প্রধান করে গঠন করা হয় সরকারি ব্যয় পর্যালোচনা কমিশন। ২০০২ সালে এই কমিশন তাদের অন্তর্বর্তীকালীন প্রতিবেদন দেয়। সেই প্রতিবেদনে প্রথম এই শাহজালাল সার কারখানা তৈরির যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘এই প্রকল্পটি ১৯৯২-৯৩ সালের সংশোধিত এডিপিতে সংস্থার নিজস্ব তহবিল হতে বাস্তবায়নের জন্য নতুন প্রকল্প হিসেবে প্রথম অন্তর্ভুক্ত হয়। তিন বছর পর ১৯৯৫-৯৬-এর এডিপিতে সংস্থার নিজস্ব তহবিলের পরিবর্তে চলতি বিনিয়োগ প্রকল্প হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ১৯৯৯-২০০০ সালের এডিপিতে সংশোধিত অননুমোদিত প্রকল্প হিসেবে দেখানোর পর থেকে চলতি এডিপি পর্যন্ত একই অবস্থায় আছে। চার বছরেও এর অনুমোদন হয়নি। প্রকল্পটি দীর্ঘ ১১ বছর ধরে এডিপিতে অন্তর্ভুক্ত থাকলেও এর কোনো বাস্তব অগ্রগতি নেই। খুব সম্ভব বৈদেশিক সাহায্য লাইনআপ করতে না পারাই এর কারণ। তা ছাড়া এত দীর্ঘদিন পর এই প্রকল্পের মূল ধারণাও আর উপযোগী নয়। তাই এই প্রকল্পটি অনির্দিষ্টকাল পর্যন্ত টেনে না নিয়ে বাদ দেওয়াই বাঞ্ছনীয়।’ এর পর ২০০৩ সালের মে মাসে বিশ্বব্যাংক এটিসহ ৬২টি গুরুত্বহীন প্রকল্পের একটি তালিকা সরকারকে দিয়ে এগুলো বাতিল করার পরামর্শ দেয়। বিশ্বব্যাংকের বক্তব্য ছিল, সরকারি খাতে সার কারখানা নির্মাণ লাভজনক হবে না। তা ছাড়া গ্যাসনির্ভর সার কারখানা তৈরিও বাংলাদেশের জন্য আর উপযোগী নয়। এর পরই বাধ্য হয়ে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় শাহজালাল সার কারখানা প্রকল্পটি বাতিল করে। ২০০৩-০৪ অর্থবছরের এডিপিতে আর এই প্রকল্পকে অন্তর্ভুক্ত দেখানো হয়নি। কিন্তু ভাগ্যবান প্রকল্প বলে কথা। এম সাইফুর রহমান প্রথমে প্রকল্পটি বাদ দিলেও ক্ষমতার শেষ দিকে এসে আবারও প্রকল্পটি এডিপিতে অন্তর্ভুক্ত করেন। একবার বাতিল হওয়া প্রকল্প আবার এডিপিতে অন্তর্ভুক্ত হওয়া নজিরবিহীন বলেই পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে। শাহজালাল ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেডের কাহিনি এখানেই শেষ নয়। জোট সরকার ক্ষমতা ছাড়ার পর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় এই প্রকল্পটি আবার এডিপি থেকে বাদ দেওয়া হয়। কিন্তু বর্তমান সরকারের সময় চলতি ২০১০-১১ অর্থবছরের এডিপিতে আবারও অন্তর্ভুক্ত হয়েছে এটি। এবার খালি অন্তর্ভুক্তই হয়নি, এর নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার মেয়াদ, প্রাক্কলিত ব্যয় এবং বৈদেশিক সাহায্যের সম্ভাব্য উৎসের কথাও জানানো হয়েছে এডিপি দলিলে। প্রকল্পটি এখন আছে বিদেশি সাহায্য পাওয়ার সুবিধার্থে বরাদ্দ ছাড়া প্রকল্পের তালিকায়। বলা হয়েছে, চলতি অর্থবছরই এর কাজ শুরু হয়ে আগামী ২০১৩ সালের জুন মাসের মধ্যেই শেষ হবে। এ জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে, পাঁচ হাজার ৩১৮ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। এর মধ্যে বিদেশি সাহায্যের অংশ থাকবে চার হাজার ২৫০ কোটি ৪০ লাখ টাকা। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই অর্থের সম্ভাব্য উৎস হচ্ছে চীনের সহজ শর্তের ঋণ ও চীনের এক্সিম ব্যাংকের অগ্রাধিকারমূলক বিক্রেতা ঋণ বা ‘বায়ারস ক্রেডিট’। এটি সরবরাহকারী ঋণ বলেই জানা গেছে। অর্থাৎ চীন থেকেই সবকিছু কিনতে হবে। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, নতুন এডিপিতে একাধিক সার কারখানা তৈরির প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এরই অংশ হিসেবে শাহজালাল সার কারখানার নামও রয়েছে। তবে সবকিছুই নির্ভর করছে বিদেশি সহায়তা পাওয়ার ওপর। তবে এডিপি দলিল অনুযায়ী, একমাত্র শাহজালাল সার কারখানার বিদেশি সাহায্যের ক্ষেত্রে সম্ভাব্য উৎস হিসেবে চীনের নাম রয়েছে। বাকি তিনটির ক্ষেত্রে বলা আছে, যেকোনো উৎস। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল, বাংলাদেশের (টিআইবি) ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান এম হাফিজউদ্দিন খান ছিলেন ২০০১ সালে গঠিত সরকারি ব্যয় পর্যালোচনা কমিশনের চেয়ারম্যান। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, অর্থনৈতিক দিক থেকে এ ধরনের প্রকল্প উপযোগী না বলেই সে সময় কমিশন এটি বাদ দিতে বলেছিল। কমিশনের যুক্তি সঠিক ছিল বলেই সে সময় প্রকল্পটি বাদও দেওয়া হয়েছিল। তার পরও কেন বারবার প্রকল্পটি অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে, সেটি একটি বড় প্রশ্ন। তিনি মনে করেন, অর্থনৈতিক নয়, বরং এর কারণ রাজনৈতিক। এর পেছনে রাজনীতি বা অন্য কিছু আছে বলেই এটি বারবার এডিপিতে ঢুকে পড়ছে।

সংগ্রহ- প্রথম আলো ২৬.০৮.১০

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s