তিন হাজার টাকার মিটার ৯ হাজারে, ঢাকা ওয়াসার সাড়ে চার হাজার মিটারে গচ্চা যাবে আড়াই কোটি টাকা

Posted: অগাষ্ট 27, 2010 in Uncategorized

তিন হাজার টাকা দামের পানির মিটার ৯ হাজার টাকা দরে কিনছে ঢাকা ওয়াসা। বাজারমূল্যের চেয়ে তিন গুণ বেশি দামে সাড়ে চার হাজার মিটার কেনা হলে সংস্থার আর্থিক ক্ষতি হবে প্রায় আড়াই কোটি টাকা। পাশাপাশি এই মিটারের পেছনে গ্রাহকের অতিরিক্ত অর্থ গচ্চা যাওয়া ছাড়াও দ্রুত বিকল হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। কারণ জার্মানির কথা বলে কার্যত স্লোভাকিয়ায় তৈরি নিম্নমানের মিটার ওয়াসাকে গছিয়ে দিতে চাইছে ঠিকাদার। এতে বিলে গড়বড় দেখা দিতে পারে। ফলে ওয়াসারও রাজস্ব আদায়ে ধস নামার আশঙ্কা আছে।
ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. তাকসেম এ খান অবশ্য কালের কণ্ঠের কাছে বিষয়টি অস্বীকার করে বলেন, ৮০ ডলার আর ২০ ডলারের শার্ট কখনোই এক হতে পারে না। এ ক্ষেত্রেও ব্যাপারটি তাই। এই মিটারে কিছু টেকনিক্যাল ব্যাপার আছে, যা ওয়াসার রাজস্ব আদায় বাড়াবে। বিষয়টি বোঝাতে অনেক ব্যাখ্যার প্রয়োজন, কিন্তু ননটেকনিক্যাল লোক বিষয়টি নাও বুঝতে পারেন।
মিটার কেনার দরপত্র আহ্বানকারী ও মূল ভূমিকা পালনকারী ঢাকা ওয়াসার সংগ্রহ বিভাগ ২-এর নির্বাহী প্রকৌশলী মাহবুবুন্নেছা মিলি বলেন, “এই মিটার কেনার ব্যাপারে আমার বিরুদ্ধে ‘বেনিফিটেড’ হওয়ার কথা অনেকেই বলছে; কিন্তু আমি বেনিফিটেড না। মিটার কেনা নিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা

না বলার জন্য বস আমাকে বলেছেন।”
মাহবুবুন্নেছা মিলির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ওয়াসার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. সাইদুল ইসলামের কক্ষে প্রবেশ করতেই তিনি এ প্রতিবেদকের উদ্দেশে বলেন, ‘জানি আপনি মিটার কেনার বিষয়ে জানতে এসেছেন। আমি এ ব্যাপারে কিছু বলব না। আমার কাছে ফাইল আসে। আমি তাতে স্বাক্ষর করি। ঠিকাদার নির্বাচন করেন নির্বাহী প্রকৌশলী। আর দর নির্ধারণ করে দরপত্র মূল্যায়ন কমিটি।’
মিটার ক্রয়-সংক্রান্ত দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির সদস্য ঢাকা ওয়াসার উপসচিব গোলাম মাওলা চৌধুরী বলেন, এই মিটার কেনার টেন্ডারে চারটি দরপত্র জমা পড়েছিল। এর মধ্যে ওই প্রতিষ্ঠানই সবচেয়ে কম দাম দিয়েছে। কাজেই নিয়ম অনুযায়ী তাদেরই কাজটা দিতে হয়।
মিটার সরবরাহের জন্য মনোনীত ওএমসি ইলস্টার মিসেথনিকের বাংলাদেশের প্রতিনিধি ওভারসিস মার্কেটিং করপোরেশন প্রাইভেট লিমিটেডের স্বত্বাধিকারী আব্দুল মান্নানের সঙ্গে কথা বলতে গত সোমবার পান্থপথে ইউটিসি ভবনের ১৬ তলায় তাঁর অফিসে গেলে তিনি দেখা করেননি। তাঁর সহকারী হারিছের মাধ্যমে বিষয়টি জানিয়ে সাক্ষাৎ চাইলে হারিছ বলেন, ‘আপনার ভিজিটিং কার্ডটি রেখে যান, স্যার মনে করলে ফোন দিয়ে আপনার সঙ্গে কথা বলবেন।’
জানা গেছে, ২০০৯ সালের ২৪ আগস্ট ঢাকা ওয়াসা ২৫ মিলিমিটারের চার হাজার ৫০০ এবং ৪০ মিলিমিটারের সমসংখ্যক মিটার কেনার জন্য দুটি আলাদা দরপত্র আহ্বান করে। দরপত্র মূল্যায়নে জার্মানভিত্তিক ওএমসি ইলস্টার মিসেথনিক নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মিটার সরবরাহের জন্য মনোনীত হয়, কিন্তু বাজারমূল্যের চেয়ে তারা ৭০ শতাংশ বেশি দাম ধরায় দরপত্র মূল্যায়ন কমিটি ওই দরপত্র বাতিল করে দেয়। এরপর পুনঃ দরপত্র আহ্বান করা হলে ২৫ মিলিমিটারের চার হাজার ৫০০ মিটার সরবরাহকারী হিসেবে ইলস্টারই মনোনীত হয়। তারা প্রতিটি মিটারের দর দেয় ৯ হাজার টাকা। অথচ ওয়াসা অনুমোদিত মিটার আমদানিকারকরা জার্মানিতে তৈরি আরো ভালো মানের একই মিটার গ্রাহকের কাছে বর্তমানে তিন হাজার ৪৮০ টাকায় বিক্রি করছেন।
১৬৩ নবাবপুর রোডের সেবা এন্টারপ্রাইজের মিটার আমদানিকারক ও বিক্রেতা রতন সরকার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আপনি ২৫ মিলিমিটার ব্যাসের যে মিটারের কথা বলছেন, এটা আমরা তিন হাজার ৪৮০ টাকা দরে বিক্রি করছি। আপনি যত খুশি নিতে পারেন। বেশি নিলে প্রয়োজনে দাম একটু কমেও দেওয়া যেতে পারে।’
আরেক পানির মিটার আমদানিকারক ও বিক্রেতা লালমাটিয়ার ব্লক সির ৬/৬ নম্বর হোল্ডিংয়ের বাংলাদেশ ন্যাশনাল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড ট্রেডিং কম্পানির কর্মকর্তা মো. সাইদ বলেন, ‘এই মিটার তারা ওয়াসার বেঁধে দেওয়া তিন হাজার ৪৮০ টাকা দরে বিক্রি করছেন। ওয়াসা দর বেঁধে না দিলে আরো কিছুটা কমে দেওয়া যেত। এ ছাড়া প্রতিটি মিটারে পাঁচ বছরের গ্যারান্টি দিচ্ছি। এই সময়ের মধ্যে কোনো সমস্যা হলে বিনামূল্যে নতুন মিটার দেওয়া হয়। গ্যারান্টি কার্ডসহ আমরা বিক্রি করছি।’ অথচ ওয়াসা ৯ হাজার টাকার মিটারে মাত্র এক বছরের গ্যারান্টি দিচ্ছে। কাজেই মিটারগুলোর মান আরো খারাপ হবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। এ ধরনের মিটার তিন হাজার টাকায় কেনা সম্ভব বলে মনে করেন ওয়াসারই একাধিক কর্মকর্তা।
ঢাকা ওয়াসার এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালের কণ্ঠকে বলেন, যেকোনো পণ্য কিনতে গেলে আইএসও (ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ড অর্গানাইজেশন) সনদ অনুসরণ করতে হয়। পানির মিটারের আইএসও সনদ হলো ৪০৬৪-১। যে মিটার কেনা হচ্ছে সেগুলো আইএসও সনদধারী নয়।
ঢাকা ওয়াসার একজন ঠিকাদার জানান, দরপত্র খোলার সময় জার্মানির তৈরি মিটার সরবরাহের কথা বলেছিল ইলস্টার, কিন্তু ওয়াসার একটি পরিদর্শন টিম ঠিকাদারের সঙ্গে আলাপ করে ও নমুনা পর্যবেক্ষণ করে যে রিপোর্ট দেয় তাতে বলা হয়, ‘ওই মিটারের কারখানা স্লোভাকিয়ায় অবস্থিত। তবে মিটারের মান পরীক্ষা হয়েছে জার্মানিতে।’ এতে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক বাংলাদেশে প্রস্তুত কোনো পণ্য জার্মানিতে নিয়ে পরীক্ষা করালেই সেটা জার্মানির হয়ে যায় কি না। আসলে ওয়াসা ও ঠিকাদারের যোগসাজশে গঠিত সংঘবদ্ধ চক্রটি জার্মানির নামে স্লোভাকিয়ায় তৈরি নিম্নমানের মিটারই ওয়াসাকে গছিয়ে দিচ্ছে। এই দুই দেশের মিটার সি গ্রেডের হলেও মানের ক্ষেত্রে স্লোভাকিয়ার মিটার অনেক নিচে। এ কারণেই প্রথম দফায় দরপত্রটি বাতিল করা হয়েছিল। তবে পুনঃ দরপত্র ডাকলে ওই কমিটিই মত পাল্টে প্রতিটি ৯ হাজার টাকা মূল্যে একই মিটার কেনার পক্ষে জোরালো মত দেয়। এ প্রসঙ্গে ঢাকা ওয়াসার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ও মিটার পরীক্ষাকারী কর্মকর্তা সাইদুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমার মতামতের তো কোনো ব্যাপার এখানে নেই। আমার নিচের প্রকৌশলীরা দরপত্র ডেকে দর নির্ধারণ করে দেয়। এ ক্ষেত্রে আমার কিছু করার নেই।’
ঢাকা ওয়াসার আরেক কর্মকর্তা বলেন, একটি প্রতিষ্ঠানকে মিটার সরবরাহের সুযোগ করে দেওয়ার জন্য বিভিন্ন ধরনের শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়। ফলে দরপত্রে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা সীমিত হয়ে পড়ে। এতে চক্রটি তাদের পছন্দমতো প্রতিষ্ঠানকে সহজেই মনোনীত করতে সমর্থ হয়।
একজন ঠিকাদার বলেন, বর্তমানে আরো ছয় হাজার ৫০০ মিটার সরবরাহের জন্য একটি দরপত্র মূল্যায়ন প্রক্রিয়াধীন আছে। এ ক্ষেত্রেও ইলস্টারকে মিটার সরবরাহকারী হিসেবে মনোনীত করার চেষ্টা চলছে।
ঠিকাদাররা জানান, অনেকে দরপত্রে অংশ নিতে চাইলেও তখন তাঁদের শিডিউল দেওয়া হয়নি। একটি চক্রই নামে-বেনামে চার-পাঁচটি শিডিউল কিনে পছন্দমতো দর দেয় ও কাজ পেয়ে যায়। মাস কয়েক আগে একাধিক ঠিকাদার স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়কে বিষয়টি জানান। মন্ত্রণালয় থেকে ওয়াসাকে তদন্তেরও নির্দেশ দেওয়া হয়। অথচ ওয়াসা তদন্ত না করে উল্টো মিটার কেনার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে।

সংগ্রহ- কালের কন্ঠ ২৮.০৮.১০

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s