পুঁজি তাঁদের শতরঞ্জি

Posted: অগাষ্ট 27, 2010 in Uncategorized

রংপুরের পীরগাছা উপজেলার কেকুরি ইউনিয়নের প্রত্যন্ত একটি গ্রাম মোংলাকুটি। উপজেলা সদর থেকে ১৭ কিলোমিটার দূরে মঙ্গাকবলিত ওই গ্রামে ১০ বছর আগেও বেশির ভাগ পরিবারেই অভাব-অনটন ছিল নিত্যসঙ্গী। কিন্তু বিউটি বেগমের (৩৭) হাত ধরে শতরঞ্জির কাজ শিখে গ্রামের দুই শতাধিক পরিবারের দৈন্য অনেকাংশেই ঘুচেছে। গ্রামটি পরিচিতি পেয়েছে শতরঞ্জির গ্রাম হিসেবে। মোংলাকুটির শতরঞ্জি এখন ইউরোপের বাজারেও বিক্রি হচ্ছে। শতরঞ্জিতে নানান কারুকাজ করা ওয়ালম্যাট, গালিচা, পাপোশ, জায়নামাজ তৈরি করা শিখে নিজে যেমন স্বাবলম্বী হয়েছেন, তেমনি গ্রামের অনেক নারীকে এ কাজ শিখিয়ে তাঁদের আর্থিক উপার্জনের পথ দেখিয়েছেন বিউটি। শুধু তাঁর শতরঞ্জি তৈরির কারখানায়ই এখন শতাধিক দুস্থ নারী বেঁচে থাকার অবলম্বন খুঁজে পেয়েছেন। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন

অন্যদের সঙ্গে নিয়ে শতরঞ্জি তৈরিতে ব্যস্ত রংপুুরের পীরগাছা উপজেলার মোংলাকুটি গ্রামের বিউটি বেগম

ফ্যাশন ডিজাইনার বিবি রাসেলও ২০০৪ সালে বিউটির কারখানা পরিদর্শন করে তাঁকে উত্সাহ দিয়ে গেছেন। যেভাবে শুরু: রংপুর সদর উপজেলার পীরজাবাদ গ্রামের বিউটি বেগমের লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যায় পঞ্চম শ্রেণীতে ওঠার পরই। ১৯৮৯ সালে ১৬ বছর বয়সে বিয়ে হয় মোংলাকুটি গ্রামের আরেক হতদরিদ্র তরুণ আনোয়ার হোসেনের সঙ্গে। আনোয়ারের দিনমজুরির আয়ে সংসার চলত না। আশ্বিন-কার্তিকের মঙ্গায় বেশির ভাগ দিন কেটেছে শাকপাতা খেয়ে।  বিউটি জানান, ১৯৯৯ সালের ঘটনা। দুই দিনেও কোনো খাবার না জোটায় বাবার বাড়িতে

চলে যান। দুর্দশার কথা শুনে বাবা তাঁকে রংপুর সদরে বিসিক শিল্পনগরের একটি শতরঞ্জির কারখানায় কাজ নিয়ে দেন। সেখানে দুই মাস কাজ শেখেন। এরপর বাবা তিন হাজার টাকা হাতে দিয়ে তাঁকে শতরঞ্জি তৈরি করে বিক্রির পরামর্শ দেন। বাড়ি ফিরে এ টাকা দিয়ে তিনি ৩০ কেজি তুলা, কিছু রং ও পাটের সুতা কেনেন। সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে বাঁশের তৈরি এক ধরনের তাঁতযন্ত্রের মাধ্যমে ৩০টি জায়নামাজ তৈরি করেন। স্বামী আনোয়ারও বিউটির সঙ্গে কাজে হাত লাগান। তিনি জায়নামাজগুলো রংপুর শহরে বিক্রির জন্য নিয়ে যান। সেখানে বিদেশি ছয় পর্যটক সাত হাজার টাকায় এগুলো কিনে নেন। এতে লাভ হয় পাঁচ হাজার টাকা। এই লাভ বিউটি ও আনোয়ারকে অনুপ্রেরণা জোগায়। শুরু হয় এগিয়ে চলা।
নতুন স্বপ্ন উঁকি দেয় তাঁদের মনে। কাজ শেখানোর মাধ্যমে এলাকার দরিদ্র নারীদের স্বাবলম্বী করে তোলার কথা ভাবেন তাঁরা। প্রথমে কেউ তাঁদের কথায় সাড়া দেননি। কিন্তু হাল ছাড়েননি বিউটি-আনোয়ার। ২০০০ সালে পাঁচজন নারীকে প্রশিক্ষণ দিয়ে শতরঞ্জি তৈরির কাজে লাগিয়ে দেন। ঘুচে যায় ওই পাঁচজনের সংসারের দৈন্য। তাঁদের দেখে ধীরে ধীরে দল বেঁধে আরও অভাবী নারীও বিউটির কাছে ছুটে আসেন কাজ শিখতে। বিউটিও প্রশিক্ষণ দিয়ে কাজে লাগিয়ে দেন।
শতরঞ্জি ঘুচাল দৈন্য: মোংলাকুটি গ্রামের হামিদা খাতুনের স্বামী আবদুল জব্বার তাঁকে ও তিন সন্তানকে রেখে আরেকটি বিয়ে করেন। অসহায় হামিদা বিউটির কাছে প্রশিক্ষণ নিয়ে তাঁর কারখানার কাজ শুরু করেন। হামিদা এখন শতরঞ্জি তৈরি করে সংসার চালান। দুই সন্তান নিয়ে কষ্টে দিন কাটাচ্ছিলেন সুলতানা খাতুন। ২০০৭ সালে ছোট মেয়ে মুক্তার বয়স যখন দেড় বছর তখন স্বামী আফজালুল মারা যান। পরে বিউটির কাছে কাজ শিখে নিজ বাড়িতে শতরঞ্জি তৈরি শুরু করেন সুলতানা। এখন তাঁর কারখানায় ১৫ জন নারীশ্রমিক কাজ করছেন। শতরঞ্জি তৈরির আয়ে বাড়িতে তিনটি টিনের ঘর তুলেছেন, ৬০ শতক জমি বন্ধক নিয়েছেন, দুটি গাভি কিনেছেন।
দৈনিক আয় ১২০ থেকে ১৩৫ টাকা: বিউটি জানান, তাঁর কারখানায় প্রতিবর্গফুট শতরঞ্জি তৈরির জন্য একজন নারীশ্রমিক ১৫ টাকা মজুরি পান। প্রথম দিকে একেকজন নারী দৈনিক পাঁচ-ছয় ফুট শতরঞ্জি তৈরি করতেন। এখন একেকজন দৈনিক আট-নয় বর্গফুট শতরঞ্জি তৈরি করেন। এই হিসাবে তাঁদের দৈনিক মজুরি আসে ১২০ থেকে ১৩৫ টাকা। আনোয়ার হোসেন জানান, আগে বাজার না থাকায় শতরঞ্জি বিক্রি করতে বিপাকে পরতেন। এখন ইউরোপের বিভিন্ন দেশ এবং জাপান ও ভারতে শতরঞ্জির চাহিদা বেড়েছে। কিন্তু চাহিদা অনুযায়ী শতরঞ্জি সরবরাহ করতে পারছেন না। শতরঞ্জি রপ্তানিকারক ঢাকার সাইফুল ইসলাম মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, প্রতিবছর বাংলাদেশ থেকে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে যে পরিমাণ কারুশিল্পসামগ্রী রপ্তানি করা হয়, তার একটি বড় অংশ শতরঞ্জি পণ্য। রংপুরের শতরঞ্জি এখন ইউরোপের বাজারে যেভাবে সুনাম অর্জন করেছে, তাতে এ শিল্পের সম্ভাবনা অনেক বেড়ে গেছে। যেভাবে তৈরি হয় শতরঞ্জি: শতরঞ্জি তৈরির কারিগর ময়না খাতুন বলেন, একটি বড় আকারের শতরঞ্জি গালিচা তৈরি করতে সুতা লাগে চার কেজি ও মাঝারি আকারের শতরঞ্জি গালিচা তৈরিতে সুতা লাগে তিন কেজি। প্রতি কেজি সুতা কিনতে হয় দেড় শ টাকা দরে। এ ছাড়া পরিত্যক্ত সুতা কিনে নানান রং মিশিয়ে শতরঞ্জি তৈরি করা হয়। একটি মাঝারি ২৪ বর্গফুট আকারের শতরঞ্জি গালিচা তৈরিতে উত্পাদনখরচ পড়ে ৯০০ টাকা। ঢাকা ও চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীদের কাছে তা বিক্রি করা হয় এক হাজার ৪০০ টাকায়। দেশীয় প্রযুক্তিতে বাঁশের তৈরি এক ধরনের তাঁতযন্ত্রের মাধ্যমে শতরঞ্জি তৈরি করা হয়। এই তাঁতযন্ত্র তৈরিতে খরচ পড়ে এক হাজার ৪০০ থেকে দেড় হাজার টাকা।
শতরঞ্জি গ্রামে এক দিন: মোংলাকুটি গ্রামের পথ ধরে বিউটির বাড়ি যাওয়ার পথে দেখা গেল বেশির ভাগ বাড়ির নারীরা বাঁশের তৈরি তাঁতযন্ত্রে শতরঞ্জি তৈরি করছেন। বিউটির কারখানায়ও দেখা গেল, শতাধিক নারী শতরঞ্জি তৈরিতে ব্যস্ত। তাঁদের মধ্যে প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন ২০ জন নারী। কেউ গালিচা, কেউ বা ওয়ালম্যাট, জায়নামাজ তৈরি করছেন। কেউ চরকায় সুতা গোছাচ্ছেন, কেউ সুতায় রং মেশাচ্ছেন। নারী কারিগরেরা জানান, এখন তাঁরা সসম্মানে বেঁচে আছেন। বিউটির কাছে প্রশিক্ষণ নিয়ে, কারখানায় কাজ করে সংসার চালাচ্ছেন।
সফল বিউটি: তিন হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে শতরঞ্জি তৈরি শুরু করে বিউটি এখন টিনের বাড়ি, আবাদি জমি ও দুটি শতরঞ্জি কারখানার মালিক। বাড়ির উঠানে একটি এবং পীরগাছার চৌধুরানী রেলস্টেশনসংলগ্ন সুবেত গ্রামে আরেকটি শতরঞ্জির কারখানা চালু করেছেন। তার মেয়ে সীমা আক্তার এসএসসি পাস করেছে। ছেলে বিপ্লব অষ্টম শ্রেণীতে পড়ছে। বিউটির স্বামী আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘পরিশ্রমী বিউটি আমাকে উদ্বুদ্ধ করেছে। তার ব্যবসায় আমি সহযোগিতা করি। বিউটি শুধু আমার স্ত্রী নয়, সে আমার একজন ভালো বন্ধু। তার কারণেই সমাজে আজ মাথা উঁচু করে চলছি।’
জনপ্রতিনিধিদের কথা: কেকুরি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যন শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘বিউটি আমাদের গর্ব। শতরঞ্জি তৈরি করে সে নিজেও স্বাবলম্বী হয়েছে, গ্রামের অনেক পরিবারের কর্মসংস্থানে সহায়তা করেছে।’ পীরগাছা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মাহাবুবার রহমান বলেন, ‘স্বল্প পুঁজি নিয়েও যে অনেক লোকের কর্মসংস্থান করা যায় তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত বিউটি। গ্রামের অভাবী নারীদের জন্য ক্ষুদ্র পরিসরে ভালো করছেন তিনি।’ উপজেলা মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তা লায়লা আনজুমান বলেন, ‘বিউটি সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন।’

সংগ্রহ- প্রথম  আলো ২৮.০৮.১০

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s