একটি এনজিওর নিবন্ধন ফিরিয়ে দিতে চাপ!

Posted: সেপ্টেম্বর 1, 2010 in Uncategorized

বেসরকারি একটি সংস্থার (এনজিও) নিবন্ধন বাতিল করে বিপাকে পড়েছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীন এনজিও-বিষয়ক ব্যুরো। ওই এনজিওর নিবন্ধন বাতিল আদেশ প্রত্যাহারের জন্য এখন বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও দূতাবাস থেকে অনুরোধ ও চাপ আসছে। এনজিওটির পুনর্নিবন্ধনের জন্য বিভিন্ন দেশ ও প্রতিষ্ঠান থেকে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে ৬০০ ই-মেইল এসেছে। বেশির ভাগ মেইল এসেছে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা

ও ইংল্যান্ড থেকে।
বাতিল হওয়া এনজিওটির নাম বাংলাদেশ সেন্টার ফর ওয়ার্কার্স সলিডারিটি (বিসিডব্লিউএস)। সরকারের একাধিক গোয়েন্দা সংস্থাও ওই এনজিওর বিরুদ্ধে তৈরি পোশাকশিল্পে অসন্তোষ সৃষ্টি, হরতাল ও অবরোধের মাধ্যমে শ্রমিকদের উত্তেজিত করে সরকারি-বেসরকারি সম্পদ বিনষ্ট করার অভিযোগ পেয়েছে।
এনজিও ব্যুরোর কর্মকর্তারা বলছেন, এসব অভিযোগের পাশাপাশি নির্ধারিত সময়ের দুই বছর পেরিয়ে গেলেও নবায়নের আবেদন না করায় গত ৩০ জুন এনজিওটির বৈদেশিক অনুদান গ্রহণ ও ব্যবহারসংক্রান্ত অনুমতি বাতিল করা হয়েছে। তবে এনজিওটির মূল নিবন্ধন সমাজসেবা অধিদপ্তরের এবং তা বহাল আছে।
ব্যুরো সূত্রে জানা গেছে, পাঁচ বছরের জন্য একটি এনজিওকে নিবন্ধন দেওয়া হয়। বিধি অনুযায়ী পাঁচ বছর শেষ হওয়ার ছয় মাস আগে নবায়নের আবেদন করতে হয়। ২০০৪ সালের ১৭ এপ্রিল কর্মজীবী মায়েদের শিশু পরিচর্যা প্রকল্পের অনুমোদন নিয়ে এনজিওটি কার্যক্রম শুরু করে। নিয়ম অনুযায়ী পাঁচ বছর পর ২০০৯ সালের ১৬ এপ্রিল এর নিবন্ধনের মেয়াদ শেষ হয়। এর আগেই ২০০৮ সালের নভেম্বরে নবায়নের আবেদন করার কথা ছিল। কিন্তু কয়েক দফা চিঠি দেওয়া হলেও এনজিওটি তা করেনি। একইভাবে আরও ৪৫০টি এনজিওর নিবন্ধন বাতিল করা হয়েছে।
ব্যুরো সূত্রে জানা গেছে, বিসিডব্লিউএস ২০০৪ সালে কর্মজীবী মায়েদের শিশু পরিচর্যা প্রকল্পের অনুমোদন নিয়ে কার্যক্রম শুরু করে। এনজিওটি তাদের প্রকল্প এলাকা হিসেবে ঢাকার বাড্ডা ও রামপুরা ইউনিয়নের কথা বললেও অননুমোদিতভাবে সাভার উপজেলার আশুলিয়ার গাজীর চটে অফিস করে কার্যক্রম চালাচ্ছে।
এনজিওবিষয়ক ব্যুরোর উপপরিচালক জাফর উল্লাহ খান প্রথম আলোকে জানান, যথাসময়ে নবায়নের আবেদন না করা ছাড়াও বিসিডব্লিউএসের বিরুদ্ধে আরও কিছু সুস্পষ্ট অভিযোগ করেছে সরকারের একটি গোয়েন্দা সংস্থা। এসব কারণেই নিবন্ধন বাতিল করা হয়েছে।
এক প্রশ্নের জবাবে জাফর উল্লাহ খান বলেন, নিবন্ধন বাতিলের পর থেকে নানা মহল থেকে ব্যুরোতে অনাকাঙ্ক্ষিত অসংখ্য ই-মেইল আসছে। অনেক অপরিচিত ই-মেইলও আসছে। এগুলোর ভাষা গ্রহণযোগ্য নয়। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন মহলকে জানানো হয়েছে।
এনজিও ব্যুরোর পরিচালক মর্যাদার একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, শর্ত না মানায় যথাযথভাবে চিঠি দিয়ে একটি এনজিওর নিবন্ধন বাতিল করা হয়েছে। কিন্তু সেই এনজিওর জন্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে ই-মেইল, চাপ ও হুমকি আসছে। তবে সরকার কূটনৈতিকভাবেই এ সমস্যার সমাধান করবে বলে জানান তিনি।
ই-মেইলে চাপ: এনজিও ব্যুরোর পরিচালক এ এম সাইফুল হাসান চলতি মাসে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিবের কাছে এ ব্যাপারে একটি চিঠি দিয়েছেন। স্বরাষ্ট্র, শ্রম ও কর্মসংস্থান; আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং জাতীয় নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কাছেও একই চিঠি দেওয়া হয়েছে।
চিঠিতে বলা হয়, ৩০ জুন অনুমতি বাতিলের পর থেকেই সংস্থাটি বিভিন্নভাবে বিদেশি প্রতিষ্ঠান বিশেষ করে মার্কিন শ্রম অধিদপ্তর ও ঢাকার মার্কিন দূতাবাসের মাধ্যমে ওই বাতিল আদেশ প্রত্যাহারের জন্য চাপ দিচ্ছে। ব্যুরোর ঠিকানায় প্রতিদিনই এ ব্যাপারে মেইল আসছে। প্রতিটি মেইলের ভাষা এক। সবগুলো চিঠিতেই ওই এনজিওর নিবন্ধন ফিরিয়ে দেওয়ার কথা বলা হয়।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বৈঠক: ৪ জুলাই ওই এনজিওর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একটি বৈঠক হয়। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনি। বৈঠকের কার্যবিবরণী অনুযায়ী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত সম্প্রতি একটি ফ্যাক্সবার্তা পাঠান। এতে রাষ্ট্রদূত জানান, তাঁর সঙ্গে আলাপচারিতায় মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের সহকারী সেক্রেটারি রবার্ট ব্লেক সম্প্রতি বিসিডব্লিউএসের নিবন্ধন বাতিল ও ব্যাংক একাউন্ট জব্দ করার বিষয়টি উত্থাপন করেন। ব্লেক তাঁকে জানান, বাংলাদেশ সরকারের এই সিদ্ধান্ত মার্কিন সরকারের জন্য উদ্বেগজনক এবং তাঁরা বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছেন।
বাংলাদেশে মার্কিন দূতাবাস থেকেও যুক্তরাষ্ট্র সরকারের উদ্বেগের বিষয়টি পুনর্ব্যক্ত করা হয়। এ ক্ষেত্রে তাদের মতে, প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশের শ্রম অধিকার নিয়ে কাজ করছে এবং শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নের বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছে। কাজেই এনজিওটির নিবন্ধন বাতিল বাংলাদেশ সরকারের মনোভব সম্পর্কে ভুল সংকেত দিতে পারে, যা প্রকারান্তরে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের জিএসপি সুবিধা পাওয়ার বিষয়টিকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শ্রম অধিকার সংস্থা বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে মার্কিন সরকারের কাছে উপস্থাপন করেছে এবং তাদের প্রত্যাশা, বাংলাদেশ সরকার ওই এনজিওর কার্যক্রম পরিচালনার বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করবে।
বৈঠকে বলা হয়, এনজিওটি সম্পর্কে সরকারের একটি গোয়েন্দা সংস্থা তৈরি পোশাকশিল্পে অসন্তোষ সৃষ্টি এবং শ্রমিকদের উত্তেজিত করার মাধ্যমে সরকারি ও বেসরকারি সম্পদ বিনষ্টকরণের প্ররোচনা দেওয়া, যথাসময়ে নিবন্ধন নবায়নে আবেদনের ব্যর্থতা ইত্যাদি অভিযোগ রয়েছে।
বৈঠকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ওই এনজিওকে বাংলাদেশে কর্মকাণ্ড পরিচালনার বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থা বিশেষ করে পররাষ্ট্র ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনার দরকার ছিল। বৈধ ও আইনানুগ কারণে সিদ্ধান্তটি নিলেও বিষয়টি সম্পর্কে যদি আগেই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে জানানো হতো, তাহলে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরকে বিসিডব্লিউএসের বেআইনি ও নীতিবহির্ভূত কার্যকলাপ সম্পর্কে জানানো যেত এবং উদ্ভূত পরিস্থিতি এড়ানো যেত।
বৈঠকে এসব বিষয় মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তকে জানানোর সিদ্ধান্ত হয়। বৈঠকে এ বিষয়ে আরও সিদ্ধান্ত হয় যে সংস্থাটি রাষ্ট্রবিরোধী কাজ থেকে দূরে থাকবে, কল্পনা আকতার ও বাবুল আকতারের সংগঠনকে দূরে রাখবে। এবং ভবিষ্যতে আইনানুগভাবে আবেদন করলে বাংলাদেশ সরকার বিষয়টি বিবেচনা করবে।
এনজিওটির বক্তব্য: নিবন্ধন বাতিল হওয়া বিসিডব্লিউএসের নির্বাহী পরিচালক কল্পনা আকতার। এক সময় তিনি পোশাকশ্রমিক ছিলেন। এনজিওটির বিরুদ্ধে অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘শ্রমিক আন্দোলনে উসকানি দেওয়ার অভিযোগে আমাদের নিবন্ধন বাতিল করা হয়েছে। কিন্তু আপনি শ্রমিক নেতাদের কাছে যান, তাঁরা কেউ বলতে পারবেন না যে আমরা কখনো তাঁদের বেআইনি কাজ করতে বলেছি। আমরা আদালতে একটি রিট করেছি। এনজিও-বিষয়ক ব্যুরোতে রিভিউ আবেদনও করেছি।’
কর্মজীবী মায়েদের শিশু পরিচর্যার কথা বলে নিবন্ধন নিয়েছিলেন কি না, জানতে চাইলে কল্পনা আকতার বলেন, ‘ওই কাজের জন্য বিদেশি অর্থসহায়তা পেয়েছিলাম। কিন্তু তাই বলে অন্য কোনো কাজ করা যাবে না, এমন কোনো আইন তো কোথাও নেই।’ কেন যথাসময়ে ব্যুরোতে নিবন্ধনের আবেদন করেননি জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা ভেবেছিলাম আবেদনের দরকার নেই। তাই আবেদন করিনি।’

songgroho- prothom alo 01.09.10

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s