‘আমার এখন হাজারটা পা’ : হাসপাতালে লিমনের পাশে…

Posted: মে 29, 2011 in Uncategorized

# নিশাত জাহান রাণা, কনক বর্মন, অদিতি ফাল্গুনী #

হাসপাতালের বিছানায় লিমন

গত ১৭ই মে মঙ্গলবার বুদ্ধ পূর্ণিমার সরকারী ছুটির সুবাদে আমরা, বাংলাদেশের খুব সাধারণ কয়েকজন নাগরিক ও ইন্টারনেটে ফেসবুক নির্ভর গ্রুপ ‘লিমনের জন্য, জীবনের জন্য’-এর জনা তিন/চার জন সদস্য ঢাকার শ্যামলীস্থ’ পঙ্গু হাসপাতালে লিমনকে দেখতে যাই। তখন বিকাল সাড়ে পাঁচটা। লিফটে লিফটম্যান যখন বলেন যে লিমনকে সাভারে সিআরপি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, তখন এক ধরণের নৈরাশ্য আমাদের ওপর ভর করলেও আমরা একবার লিমনের বেড পর্যন্ত যাবার সিদ্ধান্ত নিই।

পঙ্গু হাসপাতালের তিন তলার করিডোরে গিয়ে একে-ওকে শুধাতেই কয়েকজন আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল লিমনের ওয়ার্ড এবং তাদের কাছ থেকেই জানা গেল যে লিমন হাসপাতালে আছে। সাভারে তাকে গতকাল যেতে হয়েছিল। কিনত্ত, গতকাল সন্ধ্যায়ই সে আবার ফিরে এসেছে। লিমনের ওয়ার্ডে ঢুকবার মুখেই দাড়িঅলা এক অনতি মধ্যবয়সী ব্যক্তিকে দেখিয়ে কেউ কেউ বললো, ‘উনি লিমনের আব্বা।’ লিমনের বাবা আমাদের সালাম দিয়ে অসুস্থ’ পুত্রের শয্যাপার্শ্বে নিয়ে গেলেন। তখন গোধূলির আলো ঈষৎ লম্বমান হয়ে লিমনের শয্যার উপর পড়েছে এবং সেই লালাভ আলোয় এক হাল্কা-পাতলা কিশোরকে আমরা দেখলাম বিছানায় বালিশে ঠেস দিয়ে বসে একটি ইংরেজি ডিকশনারি পড়ছে। তার চারপাশে ছড়িয়ে আছে বেশকিছু সংবাদপত্র ও পত্রিকা। একটি নীল রঙের টি-শার্ট ও লুঙ্গি পরা এই কিশোর আমাদের দিকে তাকিয়ে উজ্জ্বল হেসে জিজ্ঞেস করলো, ‘কেমন আছেন আপনারা?’ এবার হতবিহ্বল হওয়ার অবস্থা আমাদেরই।

‘তুমি কেমন আছ লিমন?’

‘জ্বি। আল্লাহ্‌র ইচ্ছায় এবং আপনাদের দোয়ায় ভালই আছি,’ একটু থামে লিমন। তারপর আবার শুরু করে, ‘কত মানুষ দেখতে এসেছে আমাকে। মিজানুর রহমান স্যার, ব্যরিস্টার সারা হোসেন, সাপ্তাহিক পত্রিকার সম্পাদক গোলাম মোর্তোজা স্যার…এই আপনারা আসলেন…এত মানুষের ভালবাসা পাচ্ছি।’

লুঙ্গির উপর থেকে লিমনের শূন্য পা’টির দিকে তাকাই আমরা, ‘তোমার শরীর এখন কেমন লিমন?’

লিমনের মুখ থেকে হাসি মোছে না। কিছুতেই হাসি মুছতে চায় না, ‘জ্বি। একটু একটু ব্যথা থাকলেও ক্রাচে ভর করে হাঁটতে পারছি। বাথরুমে যেতে পারছি। শরীর ভালই আছে।’

‘তুমি এটা কি পড়ছিলে?’

‘ডিকশনারি। এবার ত’ পরীক্ষা দিতে পারলাম না। ইচ্ছা আছে সামনের বার ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা দেব।’

লিমনের চোখ নয়, এবার আমাদের চোখই ঝাপসা হয়ে আসতে চায়। এই অপাপবিদ্ধ কিশোরের একটি পা কেন গুলি করে কেটে নিতে হল দেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এলিট ফোর্সের সশস্ত্র সদস্যদের? কেনই বা সরকার এই ব্যর্থতার দায় স্বীকার করে লিমনের পাশে দাঁড়াতে এগিয়ে আসছে না? কেন এই অসহায় কিশোরকে দেখার সময় অদ্যাবধি করে উঠতে পারলেন না আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রী বা বিরোধী দলীয় নেত্রী?

ষোল বছরের লিমন আমাদের শোনায় তার জীবনের সামপ্রতিক ঘটে যাওয়া রক্ত হিম হওয়া আখ্যান। যার কিছুটা আপনারা ইতোমধ্যেই শুনেছেন। কিছুটা হয়তো শোনেন নি। ‘ঐ তো ৫ই এপ্রিল ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা শুরু হবার কথা । বাসায় বইসা তাই সারাদিন পড়ি। ২৩ তারিখ বিকালে মা বললো আমাদের একটা গরু খুঁইজা আনতে। গরু খুঁইজা আসার সময় আমার সাথের একটা বাচ্চা ছেলে আছিলো। হে কয়, লিমন ভাই- চলেন নদীর ধারে ব্রিজের উপর একটু বসি। হেই যে বসতে গেলাম আর ত’ র‌্যাবে আইলো। একজন আমার মাথায় অস্ত্র তাক করলো। আমি তার পায়ে ধইরা কইলাম, আমি যে কলেজে পড়ি সেই কলেজের স্যারদের গিয়া জিজ্ঞাসা করেন যে আমি ছাত্র না সন্ত্রাসী। যদি হ্যারা কয় যে আমি সন্ত্রাসী, তইলে আমারে নয় গুলি কইরা মাইরা ফালাইয়েন। কিন্তু, পাঁচ তারিখ আমার ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা। আমার জীবনটা শ্যাষ কইরেন না। তখন র‌্যাবের একজন আমারে একটু দূরে নিয়া আমার পায়ে গুলি করলো।’

লিমনের মতে সেদিন যদি ‘র‌্যাবে’র কর্মকর্তাদের বদলে তার গরীব পিতা-মাতা তাকে হাসপাতালে নিত, তবে হয়তো সে বেঁচে যেত। হয়তো তার পা এভাবে কাটা পড়তো না। তার দরিদ্র পরিবার সর্বস্ব দিয়ে হলেও সে রাতেই তাকে ঢাকায় পাঠানোর ব্যবস্থা করতো ।

‘আমার জ্ঞান ফিরলো আর তেইশ তারিখ রাত্রে। সারা শরীরে ব্যথা। র‌্যাবের লোকরাই আমাকে সেইখানে পৌঁছায় দিছিল। পরের দিন খবর পাইয়া আমার বাবা মায়ে হাজির। মানুষের কাছে ধার-কর্জ কইরা পাঁচ হাজার টাকায় একটা মাইক্রো ভাড়া কইরা আমার বাবা মা আমারে ঢাকায় নিয়া আসলো,’ লিমন বলে চলে।

‘ঢাকায় প্রথমে আমারে আনছে হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে। তারপর সেইখান থিকা আমারে রেফার করছে পঙ্গুতে। পঙ্গুতে ডাক্তাররা কইলো আমার পা কাইটা ফেলতে হবে। নয় তো সেপটিক পচন উঠছে। ২৭ শে এপ্রিল দুপুর একটায় আমারে ওটিতে নিবো কইলো। আমার মা ডাক্তারদের বললো, আমার ছেলের পা’টা বাঁচান। কিনত্ত, ডাক্তাররা দ্যাখে কি সেপটিক প্রতি ইঞ্চি লাফায় লাফায় উপরে উঠতেছে। পা-টা না কাটলে পুরা শরীরে, আমার ব্রেইনে এ্যাটাক করবে। তখন ডাক্তার আমারে বললো, ‘তুমি তোমার পা চাও না জীবন চাও?’ আমি তখন শুধু কান্দতেছি। পরে আমারে নিয়া গেল ওটিতে। আমারে লোকাল এ্যানেসে’শিয়া দিছে। আমি ব্যথা পাচ্ছি না, কিনত্ত দেখতেছি যে আমার পা কাটা হবে। তখন সেইয়া য্যানো আমারে দ্যাখতে না হয়, তাই ঘুমায় পড়ছি।’

‘এখান থিকা আমারে যখন বরিশাল জেলে নিলো, জেল থিকা বেইলে ছাড়া পাবার পর হাসপাতালে আমার খালা গোসল করতে নিয়া আমার মাথায় পানি দিয়া মোছায় কইলো, ‘আয়।’ খালারও মনে নাই যে আমার আর পা নাই, আমারও মনে নাই। ক্রাচ না নিয়াই হাঁটতে গিয়া পইড়া গেলাম। কান্না আইলেও হাসলাম য্যানো খালা দুঃখ না পায়। খালা কিনত্ত কাইন্দা দিল।’

তবু, জীবন নিয়ে এখনো অনেক স্বপ্ন ও আশা লিমনের। ‘আমার বাসা থিকা কলেজ প্রায় পাঁচ-ছয় কিলোমিটার দূর। আসতে যাইতে বাস ভাড়া লাগে দশ টাকা। তাই দুই টাকায় খেয়া পার হইতাম তিন/চাইর কিলোমিটার আর বাকি এক/দুই কিলোমিটার হাঁটতাম। তা’ সমস্যা হবে না। আমার এক ক্লাসমেটের মামা ‘ডেইলি স্টার’ পত্রিকার লোকাল সাংবাদিক। উনি আমারে হাসপাতালে দেইখা গেছেন। উনি বলছেন যে ওনার বাসা যেহেতু কলেজের কাছে, আমি ওনার বাসায় থাইকাও পড়তে পারবো।’

আহা, লিমনের সব স্বপ্ন ও আশা পূরণ হোক! পড়-য়া লিমন আমাদের আব্রাহাম লিঙ্কনের গল্প শোনায়। দেখায় ‘প্রথম আলো,’ ‘সমকাল’ ও ‘সাপ্তাহিক’ সহ নানা পত্রিকায় ওর উপর লেখা বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদন ও নিবন্ধ।

‘গতকাল সাভারে তুমি কোথায় গেছিলে?’

‘আমারে সিআরপি হাসপাতালে নিছিলো। সেইখানে আমার পায়ের মাপ নিছে। কৃত্রিম পা’র জন্য। জানেন, ডাক্তাররা বলছে আমার কাটা পায়ের উপরের যে অংশটা এখনো বাকি আছে, সেইটায় অনেক জোর আছে। আমি অনেক ফুটবল খেলছি ত’। এই জোরঅলা অংশটার নিচে কৃত্রিম পা ভালই জোড়া লাগতে পারে। তখন ত’ আমি আবার স্বাভাবিক হয়ে যাব,’ প্রগাঢ় উদ্দীপনায় লিমনের চোখ জোড়া চকচক করে। হে অলক্ষ্য ডানার কিশোর দেবদূত! তুমি বাঁচো, তুমি হাঁটো!

অসুস্থ’ লিমন আমাদের সাথে আতিথেয়তাও করতে চায়, ‘আপনারা আমার জন্য যে ফল আনছেন…অনেকেই অনেক কিছু আনে…এইখান থেকেই কিছু খান!’ অশ্রু সম্বরণ করা তখন সত্যিই কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।

বের হয়ে আসার সময় লিমনের বাবা আমাদের বলেন, ‘আমি আর কিছু চাই না- আমি শুধু ন্যায়বিচার চাই। আমারে এর মধ্যেই কেউ কেউ আপোষ রফার প্রস্তাব দিছে। বলছে আমার ছেলেরে সিঙ্গাপুরে পাঠায় চিকিৎসা করাবো। শুধু যেন আমি মামলা তুইলা নিই। আমি গরীব দিনমজুর হইতে পারি, কিন্তু আমি লোভী না। যে সাংবাদিকরা, মিজানুর রহমান স্যার, যে উকিলরা মামলা লড়ছে, যারা যারা আমার ছেলের পক্ষে দাঁড়াইছে, তাদের মত নিয়াই আমি লিমনের চিকিৎসা করাবো। বাংলাদেশে থাইকাই যেটুক চিকিৎসা হবে, সেইটুক চিকিৎসায় আমার ছেলে বাঁচলে বাঁচবে আর মরলে মরবে।’

‘আমি নির্লোভ বইলাই গরীব হওয়া সত্ত্বেও আমার তিনটা ছেলে মেয়েই শিক্ষিত। বড় দুইজন বি,এ, পড়তেছে আর লিমন এইবার ইন্টারমিডিয়েট দিত। লিমনরে যে রাতে বরিশাল জেল থিকা বেইলে বাইর কইরা হাসপাতালে নিয়া যাচ্ছি, অত রাতে রাস্তার দুই পাশে অনত্মত: পাঁচ হাজার মানুষ শুধু আমার ছেলেরে এক নজর দেখতে দাঁড়ায় আছে। মানুষের এই ভালবাসা ক্যামনে ভুলি?’ লিমনের বাবার চোখে জল।

‘প্রথম প্রথম একটা পা যাওয়ার পর আমার খুব কষ্ট লাগছে। কিনত্ত এখন আর কষ্ট লাগে না। মনে হয় বাংলাদেশের হাজারটা মানুষ আমার সাথে আছে। তাদের সবাইর পায়ে ভর করে আমার ত’ এখন হাজারটা পা,’ লিমন স্বপ্ন ভরা চোখে বলে।

(শেষ…)

 

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s